Responsive image

২০২১ সাল: বছর নুতন, চ্যালেঞ্জ পুরাতন

ড: মিহির কুমার রায়: আমার এক স্বজন আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন নুতন বছরটি কেমন যাবে এবং বিদায়ি বছরটি কেমন কেটে ছিল। আমি সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে বলেছিলাম যে দিন যায় তা ভালই যায় আর যে দিন আসে সেটা ততটা ভাল নয়। জানিনা নূতন বছর আমাদের জন্য কি উপহারটি নিয়ে অপেক্ষা করছে। শুধু নিকট ভবিষ্যত নয়, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বারবার গল্প হয়ে ফিরবে বিদায়ী সালটি। এই বছরটিকে বরণ করার সময় কেউ ভাবেনি যে, বছরটি মানব জাতির জন্য এতটা বিষময় হবে। ২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত শব্দ করোনাভাইরাস (কোভিড – ১৯), যেখানে পৃথিবীর প্রায় ৪০০ কোটি মানুষকে প্রায় বছর ধরে ঘরবন্দী থাকতে বাধ্য করেছে এই মহামারী ও মৃত্যুবরণ করেছেন ৩৪ লাখেরও বেশী মানুষ যার শীর্ষে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর বাংলাদেশে মৃত্যুবরণ করেছেন ১২ হাজার ৮৩৯ জন (উৎস: দৈনিক সংবাদ, ৭ জুন, ২১২১)। বিদায়ী সাল টিকে বিশ্বের প্রতিটি মানুষ মনে রাখবে মহামারী করোনার বছর।

এই উপমহাদেশের প্রখ্যাত সাংবাদিক আব্দুল গাফফার চৌধুরি বলেছিলেন, ২০২০ সালটি যেন ছিল মৃত্যুর মিছিলের মাস এবং এরি মধ্যে আমরা অনেক বুদ্ধিজীবি, প্রযুক্তিবীদ, চিকিৎসক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, নাট্যকার, নিরাপত্তাকর্মী ও সমাজকর্মীকে হারিয়েছি, যা আমরা ১৯৭১ সালে পাকসেনা কর্তৃক নির্মম ভাবে বুদ্ধিজীবি হত্যার সময় দেখে ছিলাম। কিন্তু এমনটাতো হওয়ার কথা ছিল না। আমরা আশা করেছিলাম এ দেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ২৬ মার্চ পর্যন্ত নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ‘মুজিব বর্ষ’ পালনের এবং সরকার বছরব্যাপী নানা বর্ণিল আয়োজনের মাধ্যমে ‘মুজিব বর্ষ’ উদযাপনের সব ধরনের প্রস্তুতিও নিয়েছিল। হঠাৎ করে নভেল করোনা ভাইরাসের কারণে উদ্ভূত বিশ্ব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সকল অনুষ্ঠান স্থগিত করতে হয়েছিল এবং পরবর্তিতে পরিকল্পনা মোতাবেক বছরজুড়ে মুজিব বর্ষ পালন সুবিধাজনক কোনো একটি সময়ে (মার্চ, ২০২১) আয়োজনের সুযোগ উন্মুক্ত রাখা হয়।

গত বছর ৮ মার্চ যখন প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়, সংক্রমণ ঠেকাতে যখন সবকিছু এক রকম বন্ধ হয়ে যায়, দুই – আড়াই মাসের ‘লকডাউনে’ অনেক লোক তাদের জীবিকা হারিয়ে পথে বসার জোগাড় হলো সেই পরিস্থিতিতে এক রকম বাধ্য হয়েই সরকার করোনা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি না হওয়া সত্বেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাদে সবকিছু খুলে দিয়ে ছিল, সেই ধারা এখনও অব্যাহত রয়েছে। করোনার ফলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর প্রাথমিক ধাক্কাটা আসে, যা দ্রুত সামলে নেয়া সম্ভব হয়। করোনাভাইরাস এর প্রভাবে বিশ্বের অর্থনৈতিক শক্তিশালী দেশগুলো যখন বিপর্যস্ত, তখনও বর্তমান সরকার তাদের অর্থনীতি সচল রেখেও সফল ভাবে করোনাভাইরাস মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়েছে। সম্প্রতি আমেরিকার ডেটাভিত্তিক জনপ্রিয় মিডিয়া ব্লুমবার্গ কর্তৃক করোনা মোকাবিলায় সক্ষমতার ভিত্তিতে বিশ্বের দেশগুলোর ওপর একটি জরিপ চালিয়েছে। জরিপে পাকিস্তান ২৯তম, যুক্তরাজ্য ৩০তম ও খোদ আমেরিকার অবস্থান ৩৭তম। সেখানে ভারতের অবস্থান ৩৯তম আর বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে থাকা দেশগুলোর মধ্যে ২০তম অবস্থানে উঠে এসেছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের নিচে রয়েছে জার্মানি, মালয়েশিয়া, রাশিয়া, সুইজারল্যান্ড, মিসর, সুইডেন, ইরান, ইরাক, ইন্দোনেশিয়া থেকে অন্তত প্রায় ১৮৫টির মতো দেশ। এর থেকেও বড় সংবাদ হচ্ছে, এই জরিপে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় সব দেশের ওপরে অবস্থান করছে। দেশের মানুষ তো বটেই, স্বয়ং বিশ্ববাসীই অবাক হয়েছে কোভিড মোকাবিলায় বাংলাদেশের এত বড় সাফল্য দেখে। এমন নয় যে, ব্লুমবার্গ কেবল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উত্থান দেখেই এ র‌্যাংকিং করেছে, বরং প্রতিষ্ঠানটি জরিপ চালিয়েছে অন্তত কোভিডের ১০টি মেট্রিকসের ওপর – যেখানে ছিল কোভিডে মৃত্যুহার, কোভিড পরীক্ষা সুবিধাদি, জনবল, স্বাস্থ্যসেবাদানের সক্ষমতা, চলাফেরা নিয়ন্ত্রণে সক্ষমতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি। এসব গুরুত্বপূর্ণ মেট্রিকস থেকে বিশ্বের সব দেশের মধ্যে ২০তম অবস্থান ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে প্রথম হওয়াটা নিঃসন্দেহে অলৌকিক কোনো ঘটনায় হয়নি। জনসংখ্যা, আয়তন বা আর্থিক সক্ষমতা কিংবা জনবল, কারিগরি সুযোগ – সুবিধা – যেদিকেই বলি না কেন, বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে উল্লিখিত ইউরোপ – আমেরিকা দেশগুলোর নিচে অবস্থান করছে। কোভিড আক্রান্তে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৪০ গুণ বেশি আমেরিকার দেশগুলোতে, ব্রাজিলে ১৫ গুণ বেশি, যুক্তরাজ্যে ত ১০ গুণেরও বেশি, ফ্রান্সে ৯ গুণ বেশি ও ভারতে মৃত্যু বাংলাদেশের থেকে ২৯ গুণ বেশি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ কোন জাদুশক্তিবলে বিশ্বের অর্থনৈতিক শক্তিধর ও পরাক্রমশালী দেশগুলোকে পেছনে ফেলে বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হলো? কোভিডের এই বিপর্যয়ে বিশ্বের মেগাশক্তিধর দেশগুলো যেখানে অর্থনৈতিকভাবে জিরো থেকে মাইনাস প্রবৃদ্ধিতে চলে যাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশ বৃদ্ধি রয়েছে, বৈদেশিক রেমিট্যান্সে এই কোভিড মহামারীর সময়ে ২১ বিলিয়ন ডলারে আছে, বৈদেশিক রিজার্ভ ৪৪ বিলিয়ন ডলারে রয়েছে অতি আশ্চর্যজনক ভাবে, যা কেবল সম্ভব হয়েছে করোনার কারণে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বিপর্যয় এবং হুন্ডি ব্যবসা কম হওয়ায় এবং সর্বোপরি বৈধ পথে ব্যাংকের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা প্রেরণে সরকার কর্তৃক ২ শতাংশ প্রণোদনা দেয়ায় এখন বেশির ভাগ রেমিট্যান্স আসছে বৈধ পথে। এছাড়া আমদানি বাণিজ্য কমে যাওয়াও রিজার্ভ বৃদ্ধির আরেকটি অন্যতম কারণ। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকে যে রিজার্ভ সঞ্চিতি হয়েছে তা আগামী এগারো মাস আমদানি ব্যয় নির্বাহ সহ সরকারের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে কাজে লাগবে। দেশের চিকিৎসা খাত, প্রশাসন এবং দেশের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত সঠিক/ সময়োপযোগী থাকার কারনে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে পাশে নিয়ে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে থাকলেন প্রধানমন্ত্রী নিজে, প্রতিদিনই স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে করণীয় ঠিক করে দিলেন, স্বাস্থ্য খাতের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ করলেন, একদিকে করোনা মোকাবিলা করতে থাকলেন, অন্যদিকে দেশের অর্থনীতি চাঙা রাখতে দেশের শিল্প-কলকারখানা খুলে দিলেন। দেশেই প্রস্তুত হতে থাকল চিকিৎসক, নার্সদের জন্য পারসোনাল প্রটেকশন ইকুইপমেন্ট (পিপিই)। এত পিপিই দেশে প্রস্তুত হলো যে, সেগুলো দেশের চাহিদা পূরণ করে অধিক লাভে বিদেশেও রপ্তানি হতে থাকল। দেশের কোভিড নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে জোড়ালো ভূমিকা ছিল হাসপাতাল চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা, টেলিমেডিসিন সেবা, সঠিকভাবে প্রচার ও প্রশাসনিক দক্ষতা। আর অবশ্যই সরকার প্রধান প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শিতা। অন্য দেশগুলো কোভিডকে অবহেলা করেছে। কোভিডকে ‘চায়না ভাইরাস’ বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছে। বাংলাদেশ শুরু থেকেই দায়িত্ব নিয়ে কোভিড মোকাবিলা করেছে এবং দেশের স্বাস্থ্য খাত প্রস্তুত করে রেখেছে। দেশের স্বল্পপুঁজি নিয়ে সঠিক পন্থায় করণীয় ঠিক করে যেভাবে এই পৃথিবী কাঁপিয়ে দেওয়া করোনা মোকাবিলা করে যাচ্ছে – এটি কেবল বিরলই নয়, সত্যিই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল পাওয়া। হোটেল, মুদি দোকান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা রেখে দেশের কর্মজীবী মানুষের আর্থিক অনটনে পড়তে দিলেন না। বিমান চলাচল চালু রেখে বিদেশে জনবল পাঠানো ও বৈদেশিক আয় কেবল ধরেই রাখলেন না, সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স পেল দেশ। বাংলাদেশের মোট আমদানির ২৬ শতাংশ আসে চীন থেকে। করোনার প্রাথমিক পর্যায়ে এ আমদানি অনেকাংশে কমে যায়। অবশ্য পরবর্তী পর্যায়ে চীন থেকে আমদানি সচল হয়। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা বাংলাদেশের একটি বড় সাফল্য, যদিও মাঝে মাঝে চাল, আটা, সবজি ইত্যাদির দাম নাগালের বাইরে চলে যায় ও সার্বিক মুদ্রাস্ফীতি ৬ শতাংশের নিচে রয়েছে। দেশে রাজস্ব সংগ্রহের পরিমাণ গত দুই দশক ধরেই ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। মোট রাজস্বের প্রায় ৮৫ ভাগই আদায় করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের মাধ্যমে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। এশীয় দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের কর – জিডিপির অনুপাত অনেক কম, যা বর্তমানে ৯ শতাংশের নিচে। শিল্প-কারখানায় নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে খুবই কম। অপ্রাতিষ্ঠানিক ও স্বউদ্যোগী ব্যবসা, হোটেল – রেস্তোরাঁ, গণপরিবহন, বিমান পরিবহন, পর্যটন প্রভৃতি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশি। অনেকে চাকরি ও কর্ম হারিয়ে শহর থেকে গ্রামে চলে গেছে। কর্মসংস্থান হারানোর এ সংখ্যা বা পরিমাণ প্রায় ২০ শতাংশ। করোনা – পূর্ববর্তী গত এক দশকে গড়ে প্রায় ৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও শিল্পায়ন বৃদ্ধি এবং সর্বোপরি সামাজিক সুরক্ষা খাতে পর্যাপ্ত সহায়তা দেয়ার ফলে চরম দারিদ্র্যের সংখ্যা ১২ শতাংশের নিচে নেমে আসে। কিন্তু মহামারীতে ক্ষুদ্র আয়ের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী কর্ম হারিয়ে চরম দরিদ্র লোকের সংখ্যা ২২ শতাংশে নিয়ে যায়। বিআইডিএসের এক জরিপে জানানো হয়, প্রায় ১ কোটি ৬৪ লাখ লোক নতুন করে দরিদ্র হয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প – কারখানা চালু করার জন্য এবং শ্রমিক ও নিম্ন আয়ের কর্মজীবীদের কষ্ট লাঘবের জন্য বিভিন্ন প্যাকেজের মাধ্যমে সরকার ১ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করে। দেশের অর্থনীতি সচল রাখা গেলেও করোনা পরিস্থিতির পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। দেশের উৎপাদন, ভোগ, আমদানি – রফতানি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, শিক্ষা – স্বাস্থ্য ব্যাংক ও আর্থিক খাত, প্রকল্প বাস্তবায়ন, সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও মুদ্রাস্ফীতি প্রভৃতি সূচকে যে প্রত্যাশা ছিল তার চেয়ে অর্জন কম হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য যে গত ডিসেম্বর, ২০২০ পর্যন্ত প্রণোদনার প্রদেয় ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকের মাধ্যমে বিতরন করা সম্ভব হয়নি ব্যাংকের অসহযোগিতার কারনে, যদিও সরকার করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলা করার জন্য নূতন প্রণোদনার ঘোষনা দিতে যাচ্ছেন শীঘ্রই। মহামারী মোকাবেলায় স্বাভাবিকভাবেই ওষুধ, স্যানিটাইজার, টিস্যু ও টয়লেট পেপার, অন্যান্য স্বাস্থ্যসম্পর্কিত সামগ্রী অধিক ব্যবহার হয়। এসব উৎপাদনকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান ভালো ব্যবসা করছে। তবে ভ্যাট হার কমানো, রেজিস্ট্রেশন খরচ কমানো এবং অপ্রদর্শিত অর্থ এ খাতে ঢালাও ভাবে বিনিয়োগের সুবিধা দেয়ার কারণে গৃহায়ন শিল্পে স্বস্তি ফিরে এসেছে। এছাড়া ৯ শতাংশ সুদে ব্যাংকঋণও পাওয়া যাচ্ছে ও এখন আমানতের সুদহার ৬ শতাংশের কাছাকাছি। তবে ঋণখেলাপিদের হয়েছে পোয়া বারো, যেমন – ২ শতাংশ কিস্তি প্রদান করে খেলাপি ঋণ রিসিডিউল করা গেছে, এছাড়া করোনাকালে কিস্তি পরিশোধ না করেও নতুন করে কেউ ঋণখেলাপি হননি, নতুন ঋণও পাচ্ছেন। ব্যাংক বিশেষজ্ঞদের মতে, যেখানে প্রায় চার লাখ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ ছিল, সেখানে উপর্যুক্ত নিয়মে রিসিডিউল করিয়ে বর্তমানে খেলাপি ঋণ ৯৫ হাজার কোটি টাকা দেখানো হচ্ছে। দেশে ইচ্ছাকৃত খেলাপির সংখ্যাই বেশি, যারা খেলাপি ঋণ পরিশোধ না করে পার পেয়ে যাচ্ছে বলে অনেকে মনে করেন।

শেয়ারবাজার নিয়ে নানা নীতি কৌশল ও প্রণোদনা দিয়ে একে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা হচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বাড়ানো ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডকে চাঙ্গা করতে না পারলে এ বাজারের ফাটকা ভাব দূর করা যাবে না। তাছাড়া আইসিবিকে আগের মতো সরাসরি শেয়ার ক্রয় – বিক্রয়ে আনতে হবে এবং ব্যাংকগুলোকেও শেয়ার লেনদেনে যুক্ত করতে হবে।। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করোনাকালে বন্ধ থাকার কারণে শিক্ষা ব্যবস্থায় স্থায়ী ক্ষতের সৃষ্টি হচ্ছে ও অটো প্রমোশন কিংবা যেনতেন মূল্যায়নে শিক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। এখানে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নকালে বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরতা ১০ শতাংশেরও নিচে নেমেছে। নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশের সক্ষমতা বেড়েছে। যেমন বর্তমানে পদ্মা সেতু, মেট্রো রেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, কর্ণফুলী টানেল, পায়রা সমুদ্রবন্দর, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ ১০ – ১২ টি মেগা প্রকল্পসহ কয়েকশ প্রকল্প দেশী – বিদেশী অর্থায়নে বাস্তবায়ন চলমান রয়েছে। করোনাকালে সরকারি ব্যয় ক্রমবর্ধমান হারে চালু থাকায় কর্মসংস্থানসহ অর্থনীতিতে গতিসঞ্চার হয়েছে।

তার পরও যে সকল বিষয় গুলো বিদায়ি বছর ২০২০ সালে আলোচিত ছিল তার মধ্যে রয়েছে এক: সরকারি খাতের ২৫টি পাটকল এবং ছয়টি চিনিকল হাজার হাজার কোটি টাকা লোকসানের কারণে যথাক্রমে ২০২০ সালের জুলাই ও ডিসেম্বরে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ফলে কয়েক লাখ শ্রমিক বেকার হয়েছে; দুই: বছরের শুরুতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টিকারি নেত্রী শামীমা নূর পাপিয়া র‌্যাবের হাতে আটক হওয়ার ঘটনা, যা সারা দেশে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়; তিন: রিজেন্টের সাহেদ কাণ্ড করোনা টেস্ট জালিয়াতি ছিল বছরের সবচেয়ে আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা; চার: জেকেজির সাবরিনা কাণ্ড রিজেন্টের সাহেদ কেলেঙ্কারিতে তোলপাড় শুরুর মধ্যেই ওঠে আসে আরেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান জেকেজি হেলথ কেয়ারের নাম; পাঁচ: পুলিশের গুলিতে মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ড; ছয়: ইউএনও ওয়াহিদার ওপর বর্বর হামলা; সাত: বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ইস্যু এরপর বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট ঘটনা ঘটলেও ১৩ নভেম্বর আবার একটি ইস্যু নিয়ে তীব্র আলোচনা – সমালোচনা আর বিক্ষোভ শুরু হয়।

তার পরও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তাগন যে তাদের প্রতিষ্ঠানের কর্মরত কর্মকর্তা/কর্মচারীদের সাথে অমানবিক আচরন করেছে (বিশেষত: চাকুরী থেকে বাদ দিয়ে) তা করোনাকালে জাতীর জন্য একটি বড় দৃষ্টান্ত হয়ে রইল। শুধু তাই নয়, মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপরও খর্গহস্ত হয়েছে ২০২০। করোনা থেকে বাঁচতে প্রিয়জনকে দূরে ঠেলে দিতে বাধ্য হয়েছে মানুষ। কোলাকুলি ও করমর্দনের মতো ভালোবাসা প্রকাশের চিরাচরিত রীতিকেও ছিনিয়ে নিয়েছে করোনা। বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা তাই বলছেন, বছরটি বিশ্বকে এমনভাবে বদলে দিয়েছে, সম্ভবত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছাড়া গত ১০০ বছরের মধ্যে আর কোনো ঘটনা এতটা প্রভাব ফেলতে পারেনি। ইয়েল স্কুল অব পাবলিক হেলথের ডিন ও রোগতত্ত্ববিদ স্টেন ভারমুন্ড বলেন, ‘এই মহামারীর অভিজ্ঞতা পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জীবনেই অদ্বিতীয় ও স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’

এখন বিদায়ি বছরের অর্থনীতির জন্য যে সকল চ্যালেঞ্জগুলো ছিল নূতন বছর ২০২১ উত্তরাধিকার সূত্রে সেগুলো পেয়েছে যা নিয়েই সরকারকে চলতে হবে। এরি মধ্যে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়ে গেছে, যা কোন দিকে মোড় নিবে তা বলা দুষ্কর এবং করোনার টীকা প্রাপ্তির সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে ভারত থেকে এবং গত কাল ৫ই জানুয়ারী, ২০২১ একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রী টীকা প্রাপ্তির বাজেট ৬ হাজার ৭৮৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকা অনুমোদন দিয়েছেন। যার মধ্যে বিশ্বব্যাংক দেবে ৫০ কোটি ডলার ও এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) ১০ কোটি ডলার দেবে। এছাড়া সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেয়া হবে ১৭২ কোটি টাকা।

বাংলাদেশের বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যলস এর সাথে ভারতের সেরাম ইনষ্টিটিউটের উৎপাদন করা অক্সফোর্ড এর টিকা চুক্তির মাধ্যমে এ মাসেই ঢাকা পৌছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথম পর্যায়ে দেশের ৪০ শতাংশ নাগরিকের ওপর কভিড – ১৯ – এর ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হবে। এর মধ্যে ৩১ শতাংশের ওপর প্রয়োগ করা হবে প্রকল্পের মাধ্যমে। রাজস্ব বাজেটের মাধ্যমে দেয়া হবে বাকি ৯ শতাংশকে। এভাবে পর্যায়ক্রমে দেশের ১৩ কোটি ৭৬ লাখ বা ৮০ শতাংশ মানুষের ওপর এ টিকা প্রয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। দেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি ২০ লাখ বিবেচনায় নিয়ে এ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া ভ্যাকসিন প্রাপ্তির অগ্রাধিকার তালিকায় নতুন করে আট শ্রেণী-পেশার মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে মত দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। ভ্যাকসিন সংরক্ষণ, কোল্ড চেইন ও সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনায় টিকার নিরাপত্তার বিষয়টি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কভিড – ১৯ টিকার ক্ষেত্রে আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এখন পর্যন্ত অনুমোদিত ফাইজার – বায়োএনটেক ও মডার্নার টিকা দুটি একেবারে নতুন প্রযুক্তিতে তৈরি। আগের কোনো টিকাই এ প্রযুক্তিতে তৈরি হয়নি এবং এ প্রযুক্তিতে কোভিড – ১৯ – এর ক্ষেত্রে এক বছরেরও কম সময়ে টিকার অনুমোদনের কারণে টিকার নিরাপত্তার বিষয়টি অনেকের মনে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জটি হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে খুলে দেয়া, যা কভিড – ১৯ এর কারনে বন্ধ রয়েছে বিগত বার মাস ধরে এবং প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক সানজিব চট্যোপাধ্যায় বলেছিলেন বণ্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে – একি ভাবে শীক্ষার্থীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই সুন্দর – ঘরের ক্রোড়েই নয়, যা করোনার বিগত বছরটিতে সংগঠিত হয়েছে অন লাইনের মাধ্যমে ক্লাস পরিচালনার মাধ্যমে। পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে অটোপ্রমোশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে নেতীবাচক, বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগন চাকুরী হাড়িয়েছে, তাদের কে মূল ধারায় ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবী। সরকার এ ব্যাপারে আগ্রহী হলেও বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়) কোন সরকারী প্রনোদণার আওতায় আসেনি বিধায় সেটি উদ্যোক্তাগনের হাতে ছেড়ে দেয়ায় সমস্যাটি সেখান থেকেই সৃষ্টি। উচ্চমাধ্যমিকের ফল হয়ত সহসা প্রকাশ হবে, তারপর শুরু হবে ভর্তি যুদ্ধ যার জন্য সরকারী – বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে পদ্ধতিগত পার্থক্য রয়েছে, যা নিয়ে অভিবাবকগন উদ্বিগ্ন রয়েছে, যার সমাধান জরুরী; তৃতীয়: নতুন বছরের চ্যালেঞ্জটি হলো করোনায় ক্ষতিগ্রস্থ অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও পুনর্বাসন। মানুষ চাকরি হারিয়েছেন, ক্ষুদ্র, মাঝারি খাতের অনেক উদ্যোক্তার ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে, চাকরিচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে, পাঁচ লাখ প্রবাসী শ্রমিক বিদেশ থেকে ফেরত এসেছেন, যাদের পূর্বের কর্মস্থলে ফিরার সম্ভাবনা কম ইত্যাদি। এক্ষেত্রে নুতন বছরে অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদার সহকারে সকল কর্মহীনদের কাজে বহাল একটি বড় কাজ হবে, ঘোষিত প্রণোদণার টাকা যাতে নিম্ন শ্রেণীর উদ্যোক্তাগণ পেতে পাড়ে সে দিকে নজর দিতে হবে; চতুর্থত:— দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় সঙ্কট বেসরকারী বিনিয়োগের অভাব। বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বলছেন গত বছরের একই সময়ের তুলনায় জুলাই – সেপ্টেম্বরে, ২০২০ স্থানীয় বিনিয়োগ ৬১ শতাংশ এবং বিদেশী বিনিয়োগ ৯৩ শতাংশ কমেছে। ব্যাংকে অলস টাকার পাহাড় জমা হয়ে আছে। জিডিপির অনুসারে বেসরকারী বিনিয়োগ ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ২৩ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ জিডিপির ০.৮৭ শতাংশে কমিয়ে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ০.৫৪ শতাংশ। অন্যদিকে বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫.৫ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫.৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫.৬৫ শতাংশ। বিদায়ী বছরের সবচাইতে আলোচিত বিষয় ছিল কৃষিপণ্যের বাজারের মূল্য অস্থিরতা, বিশেষত: পেঁয়াজ ও আলুর মূল্যে এবং এখন চলছে চালের মূল্যে, অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে (প্রতি কেজি মোটা চাল ৫০ টাকার নিচে নয়) যা করোনায় সৃষ্ট দারিদ্র শ্রেণীর লোকদের আরও কষ্টের কারন; পঞ্চমত: করোনায় সৃষ্ট মানুষের আচরন, যে সমাজ কাঠামোতে একটি নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে এসেছে তা তেমন কোন আলোচনায় আসেনি, করোনা মোকাবেলা শুধু সরকারেরই একক দায়িত্ব, ধনী – বণীক শ্রেণী কিংবা সুশীল সমাজের কি কোন ভূমিকা নেই? সাম্প্রতিক কালে দেশে আয় বৈষম্য বেড়েছে, অমানবিক আচরণ বেড়েছে, অভাব দাড়ে দাড়ে আঘাত হেনেছে, চাকুরিচ্যুতরা এক নুতন আচরণ দেখছে সমাজের কাছ থেকে যা সবই করোনাকালের অবদান। সামাজিক সংগঠন বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনকে কেবল লকডাউনের সময় দেখা গেছে খাদ্য/ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে অসহায়দের পাশে দাড়াতে যা প্রশংসার দাবি রাখে। তার পরও একটি স্বল্প উন্নত দেশের সরকার হয়েও করোনার মোকাবেলায় যে ব্যবস্থা গ্রহন করেছে তা সারা বিশ্বে প্রশংসীত হয়েছে। নতুন বছরে স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্ণ হয়েছে এবং আগামী মার্চে সবাই সাড়ম্বরে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনের আশায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। ‘করোনা সংক্রমণের্ গতি দেখা যাচ্ছে কমে আসছে এবং টিকা প্রাপ্তি, এর সঠিক বিতরন নিয়ে সরকারের যে পরিকল্পনা রয়েছে তার সফল বাস্তবায়ন হবে বলে আশা করা যায়।

লেখক: অধ্যাপক, গবেষক, ডীন ও সিন্ডিকেট সদস্য, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।

Short URL: http://biniyogbarta.com/?p=146905

সর্বশেষ খবর