Responsive image

বাজেটে কালো টাকা সাদা ও অর্থনীতিতে প্রভাব

ড. মিহির কুমার রায়: গত এক যুগ ধরে প্রতি বছর বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়ে আসছে সরকার। করোনাকালীন অর্থপ্রবাহ বাড়াতে চলতি অর্থবছরের বাজেটে ১০ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার ঢালাও সুযোগ দেয়া হয়। কিন্তু এবার কালো টাকা সাদা করায় লাগাম টানছে সরকার। অর্থনীতিবিদ, সৎ করদাতাদের দাবির মুখে বন্ধ হচ্ছে কালো টাকা সাদা করার অবাধ সুযোগ। এছাড়া দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় কর ছাড়ের পাশাপাশি দেশে উৎপাদন হয় এমন পণ্য আমদানিতে করারোপ করা হচ্ছে। এখানে উল্লেখ্য যে চলতি অর্থবছরে কালো টাকা সাদা করার অবাধ সুযোগ নিয়েছেন অনেক করদাতা। এর থেকে সরকার রাজস্ব পেয়েছে প্রায় ৮৮০ কোটি টাকা। আর অর্থনীতিতে যোগ হয়েছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। এই অর্থ অর্থনীতিতে যোগ হলেও সৎ করদাতারা এর বিরোধিতা করে আসছে। অর্থনীতিবিদরাও বারবার এই বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন যে এতে সাময়িক সুবিধা হলেও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা। সবকিছু বিবেচনায় আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে ১০ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার অবাধ সুযোগ বন্ধ করার প্রক্রিয়া চলছে। যদি ১০ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ থাকে, তাহলে যারা ২৫ শতাংশ কর দেন তারাও এই সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করবেন বিধায় রাজস্ব আহরণের সুবিধার্থে এই সুযোগ বন্ধ হচ্ছে।

আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বেশ কিছু কৌশল নিয়েছে এনবিআর। আগামী বাজেটে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে রাজস্ব ফাঁকি বন্ধে। নতুন অর্থবছরে করহার না বাড়ালে কর আদায় নিশ্চিত করতে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে ভ্যাট রিটার্ন জমা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভ্যাট গোয়েন্দাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া সামর্থ্যবান টিআইএনধারীরা রিটার্ন না দিলে কর অফিস নথি খুলবে করদাতার। ভ্যাট আহরণ নিশ্চিত করতে জটিলতা থেকে বেরিয়ে আসতে চায় এনবিআর। আগামী বাজেটে ভ্যাটের সরল সুদ ও জরিমানার হার ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হবে। সেই সঙ্গে আমদানি পর্যায়ে আগাম কর ৪ শতাংশ থেকে ৩ শতাংশ করা হচ্ছে। দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় উৎপাদন পর্যায়ে এয়ারকন্ডিশনার ও রেফ্রিজারেটরে ভ্যাট সুবিধা অব্যাহত থাকছে আগামী বাজেটে। বাজেটে দেশীয় ই-কমার্স খাত প্রসারে কর ছাড় আসছে। বাজেটে কৃষি খাতকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। দেশে উৎপাদন হয় এমন কৃষিপণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করার ক্ষেত্রে করারোপ করা হচ্ছে। এছাড়া শুল্কায়ন কার্যক্রম সহজ ও ঝামেলামুক্ত করতে কাস্টম কমিশনারদের শুল্কায়নের লিমিট বাড়ছে। অর্থাৎ আগে ৫০ লাখ টাকা রাজস্ব হলে কমিশনাররা পণ্য ছাড় করতে পারতেন। এর বেশি হলে এনবিআরের অনুমোদন নিতে হতো। আগামী বাজেটে এর সীমা বাড়ানো হচ্ছে বলে নিশ্চিত করেছে এনবিআর সূত্র।

দেশে ঘোষণা দিয়ে প্রথম কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া হয়েছিল ১৯৭৫ সালে, সামরিক আইনের আওতায়। এ পর্যন্ত ১৭ বার কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া হয়েছে এবং বৈধ করা মোট টাকার পরিমাণ প্রায় সাড়ে ২২ হাজার কোটি টাকা। সবচেয়ে বেশি টাকা সাদা হয়েছে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে ১৪ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা এবং এর আগে ২০০৭ ও ২০০৮ সালের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ৩২ হাজার ৫৫৮ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এই সুযোগ নিয়েছিল। তখন রেকর্ড পরিমাণ ৯ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা বৈধ করা হয়েছিল। ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে কালো টাকা সাদা করার যে সুযোগ দেয়া হয়েছে এবং কিছু লোক সেই সুযোগটি হাত ছাড়া করেনি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য মতে, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে ১৪ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা অপ্রদর্শিত আয় ১ হাজার ৪৩৯ কোটি টাকা কর দিয়ে বৈধ করেছেন ১০ হাজার ৩৪ জন করদাতা, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন রেকর্ড!

বাংলাদেশে ২০১২-১৩ সাল থেকেই জরিমানা দিয়ে কালো টাকা সাদা করার একটা স্থায়ী নিয়ম তৈরি করা হয়েছিল। প্রতিবারই বলা হয় এটাই শেষ সুযোগ কিন্তু কালো টাকা বিশেষ সুযোগ দিয়ে শেয়ারবাজার বা আবাসন খাতের মতো সুনির্দিষ্ট কিছু জায়গায় এলে সেটি দেশের অর্থনীতিতে সত্যিকারভাবে কতটা ভূমিকা রাখে তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। ২০০৯ সালে নতুন সরকার গঠন করার পর আওয়ামী লীগ আবারো কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়। এমনকি আয়কর অধ্যাদেশ জারি করে ২০১২ সালে স্থায়ীভাবে নতুন একটি ধারা সংযোজন করে কালো টাকা সাদা করার আইনি সুযোগ রাখা হয়। এই ধারাটি হচ্ছে ১৯-ই। এর ফলে প্রযোজ্য আয়করের সঙ্গে ১০ শতাংশ জরিমানা দিলে যে কেউ অর্থ সাদা করতে পারবেন। প্রায় সব সরকারই অবাধে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়েছে, নানা ধরনের হুমকিও দেয়া হয়। কিন্তু সেসব হুমকি কেবল বক্তৃতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় কালো টাকা সাদা করার ক্ষেত্রে তেমন কেউ উৎসাহ দেখায়নি। অনৈতিক একটা বিষয়কে বৈধ করার সুযোগ দেয়া হলে সৎ করদাতাদের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি হয় এবং এটা সামগ্রিকভাবে দুর্নীতিকেই উৎসাহিত করে। প্রকারান্তরে এর মাধ্যমে দুর্নীতির বিস্তারকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করা হচ্ছে। এ কারণে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি নির্মূলের জন্য কালো টাকা সাদা করার এ সুযোগটি চিরতরে বন্ধ করাই শ্রেয় বলে সংশ্লিষ্টদের দৃঢ় বিশ্বাস। এ প্রক্রিয়া অবৈধভাবে আয় উপাজর্ন ও আয়কর ফাঁকিকে যেমন উৎসাহিত করবে অন্যদিকে বৈধপথে উপার্জনকারী নিয়মিত ও সৎ করদাতাকে নিরুৎসাহিত করবে, দুই দলের মধ্যে বৈষম্য বাড়াবে এবং অনৈতিক চর্চা্ প্রসারিত হবে। কিন্তু তাত্ত্বিকভাবে এ বিষয়টিকে অর্থনীতির চর্চায় তেমনভাবে গুরুত্ব দেয়া হয় না বিশেষত শিক্ষা কিংবা গবেষণা কার্যক্রমে বিধায় এ বিষয়টিতে তেমন কোন গুরুত্বপূর্ণ লেখা অনেক ক্ষেত্রে চোখে পড়ে না।

তাই প্রশ্ন, স্বভাবতই বিষয়টি কী আসে? কালো টাকার একটা নিজস্ব ধারণা রয়েছে; যেমন দেশের কর আইনে কালো টাকার সংজ্ঞা না থাকলেও অপ্রদর্শিত আয় কথাটি উল্লেখ আছে বিধায় যে ব্যক্তি তার আয়কর রিটার্নে তার আহরিত আয় প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হয় সেই টাকাকেই কালো বলে ধরা হয়; যদিও এই আয় অবৈধ পথে নাও হতে পারে।

এখন অনেকে বলছে অপ্রদর্শিত আয় দুই রকমের যথা: (১) বৈধ অর্জন কিন্তু আয় রিটার্নে প্রদর্শিত হয়নি; (২) অবৈধ উপায়ে অর্জন; যার ওপর আয়কর দেয়া হয়নি। এখন নির্দিষ্ট পরিমাণ কর জরিমানাসহ প্রদান সাপেক্ষে অর্থনীতির মূলধারায় কালো টাকাকে সম্পৃক্ত করার প্রচেষ্টাকে কালো টাকা সাদা করা বলা হয়। অর্থনৈতিক দর্শনে কালো টাকাকে বিভিন্নরূপে দেখানো হয়েছে। যেমন- ধুসর, নিমজ্জিত, অনানুষ্ঠানিক, সুপ্ত, সমান্তরাল ইত্যাদি। যার মূল উৎস অনৈতিকতার ছাপে আবদ্ধ বিভিন্ন রূপে যেমন- ঘুষ, মানুষ পাচার, স্বর্ণ পাচার, চাঁদাবাজি, জমি কেনা-বেচার দালালি ইত্যাদি। যার গতিময়তা অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে বেশি যা কোন নিয়মের ছকে আবদ্ধ করা যায না।

আয়কর আইনের ১৯(ই) ধারায় ৩(ঘ) উপধারা অনুযায়ী বেআইনি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমের মাধ্যমে অর্জিত আয় যথাযথ আয়কর এবং ১০ শতাংশ হারে জরিমানা দিয়ে টাকা সাদা করা যাবে না, যা নৈতিকতা ও সংবিধান পরিপন্থী; যা সংবিধানের ২০(২) অনুচ্ছেদ বলা হয়েছে। বিগত বণিক বার্তায় একটি প্রবন্ধে বলা হয়েছে কালো টাকা সাদা টাকা উভয়ই মানি সার্কুলেশনের অন্তর্ভুক্তি হলেও অর্থনীতিতে প্রথমটির প্রভাব নেতিবাচক; যা সরকারের হিসাবের মধ্যে থাকে না, বিশৃঙ্খল গতিতে চলতে থাকে, আর্থ-সামাজিক পথে ক্ষত সৃষ্টি করে; যা প্রকারান্তরে ব্যাষ্টিক সামষ্টিক অর্থনীতিতে অবক্ষয়ের রাস্তাকে প্রশস্ত করে। আবার এই কালো টাকা প্রচলিত আইনকে ফাঁকি দিয়ে জনপদে বিচরণ করে এবং ন্যায়সঙ্গত শ্রমের চেয়ে প্রাপ্তি বেশি থাকায় এ টাকা ব্যয়ের সময় অর্থনীতির নিয়মকানুন মেনে চলা হয় না। নোবেল বিজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ ড. অমর্ত্য কুমার সেন বলেছিলেন সভ্যতার গোড়া থেকে সাদা ও কালো পরস্পরকে হাত ধরাধরি করে আসতেছে; যা পৃথিবীর সব দেশেই কম-বেশি রয়েছে একটি নির্দিষ্ট সীমারেখার মধ্যে, যেমন পশ্চিমা বিশ্ব, মধ্যম আয়ের দেশ লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ার কিছু দেশে যেখানে অফশোর হিসাব বলে একটি কার্যক্রম প্রচলতি আছে। যেখানে বিশেষায়িত অঞ্চলে কালো টাকা বিনিয়োগ করলে কোন প্রশ্নের মোকাবেলা করতে হয় না; যা অর্থনীতিতে বিনিয়োগের একটি বৃহৎ অংশ দখল করে রয়েছে। এখন নিম্ন-মধ্যবিত্ত আয়ের দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থানটা কী তা নিয়ে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কারণ বাজেট আসলেই এ বিষয়টি নিয়ে নানা ধরনের উক্তি করতে দেখা যায়। বিশেষত বিশ্লেষকদের কাছে যা ছদ্মবেশে বিষয়টি রয়েই যায়; যা কর্তৃপক্ষ সরাসরি বলতে বা ঘোষণায় কিছুটা রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গির আশ্রয় নেয়। কারণ বিষয়টি অনেকটা অনৈতিক দার্শনিক শাস্ত্রের মানদন্ডে। ১৯৭১ সাল থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পরিচালিত রাষ্ট্র-কাঠামোতে কালো টাকা সাদা করার বিতর্কটি ছিল না। কিন্তু পঁচাত্তর পরবর্তী সামরিক সরকারগুলো এ বিষয়টিকে নিয়ে আসে বিভিন্ন আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এবং বাজেটের আগে-পরে এ বিষয়টি হালে পানি পায় এই যুক্তিতে, যা জিডিপির একটি বড় অংশ; যা অর্থনীতির মূল ধারায় নিয়ে আসতে না পারলে উন্নয়ন অনেকাংশে ব্যাহত হবে। বাস্তবে দেখা গেল এই প্রক্রিয়ায় সাড়া খুব একটা পাওয়া যায় না তিনটি কারণে যথাক্রমে: এক. জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) হয়ত নির্ধারিত ২০% (১০% কর ও ১০% জরিমানা) নিয়ে আয়কর রিটার্নের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে কালো টাকা সাদা করার ব্যবস্থা করল কিন্তু ভয়টা হলো ভবিষ্যতে এই রেকর্ড ধরে কালো টাকার মালিক কোন হয়রানির স্বীকার না হয়? যেমন বর্তমান সরকার ধারাবাহিকভাবে ১২ বছর যাবত ক্ষমতায় রয়েছে এবং গত দুটি নির্বাচনের আগে তার চির প্রতিদ্বন্দ্বী বিরোধী দলের নেতৃত্বকে বলতেন ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত এবং ২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত কত কালো টাকা সাদা করেছে; যা একটি রাজনেতিক বিতর্ক; দ্বিতীয়. দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এ বিষয়টি নিয়ে ভবিষ্যতে কোন প্রকারের ঝামেলা করবে কিনা এবং যদি করে তবে দেশের প্রচলিত আইনে তাকে শাস্তি পোহাতে হবে। কারণ দেশের প্রচলিত আইনে এর কোন সুরক্ষার কথা বলা নেই; তৃতীয়ত. সামাজিক মর্যাদার ভয় রয়েই গেছে। কারণ বাংলাদেশের রক্ষণশীল সমাজে কালো টাকার মালিক যদি আয়কর রিটার্নের মাধ্যমে কোন মামলায় জড়ায় তবে তা বংশ পরম্পরায় যাতনা বইতে হবে; যা মানসিক অশান্তির কারণ হতে পারে। এখন আসা যাক অর্থনীতিতে কালো টাকার পরিমাণ কত এবং এখন পর্যন্ত কত টাকা সাদা করা হয়েছে এই হিসাবে। বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের ২০১১ সালের গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী দেখা যায় যে, ২০০৯ সালে অর্থনীতিতে ৬২.২ শতাংশ কালো টাকা ছিল, যার পরিমাণ ৫ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা; যা সম্প্রতি ঘোষিত বাজেটের চেয়ে কিছু কম। বাংলাদেশে ১৯৭৫ পরবর্তী সময় থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র ১৩ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা সাদা করা হয়েছে এবং সরকারের রাজস্ব আদায় হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৪৫৫ কোটি টাকা; যার জন্য এ সুযোগটা রাখা হয়েছে ষোষিত – অঘোষিতভাবে। এখন প্রশ্ন থাকে এই আদায়কৃত কত টাকা শর্তমতে উৎপাদন খাতে ব্যায়িত হয়েছে? বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, দেশে অপ্রদর্শিত কালো টাকার পরিমাণ ৭ লাখ হাজার কোটি টাকার উপরে; যার কোন প্রভাব দৃশ্যত অর্থনীতিতে দেখা যাচ্ছে না। এই কালো টাকার উপস্থিতির কারণে অর্থনীতিতে যেসব সমস্যা দৃশ্যমান তা হলো (১) ধনী-গরীবের আয়ের বৈষম্য সৃষ্টি; (২) দ্বৈত অর্থনীতি (কালো বনাম সাদা); (৩) জাতীয় আয়ে তত্ত্ব বিভ্রাট; (৪) সরকার কর্তৃক রাজস্ব হারানো; (৫) সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ভাটা; (৬) বাহুল্য ব্যয় বৃদ্ধি; (৭) দুষ্প্রাপ্য সম্পদের ওপর বাড়তি চাপ যা বাজার ব্যবস্থায় মূল্য বাড়ায়; (৮) সমাজের নৈতিক মানদন্ড নষ্ট হয়; (৯) উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে ইত্যাদি। এসব সমস্যার সমাধানকল্পে একটি স্বল্প-দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন; যা বাজেট বক্তৃতায় তেমন উল্লেখিত হয়নি। তবে দীর্ঘমেয়াদি কালো টাকার অনুশীলন কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়; যা এখন থেকেই সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। যেমন:- প্রখ্যাত জার্মান অর্থনীতিবিদ ডেভিড মোরিলের বক্তব্যের আলোকে কালো টাকার পরিমাণ নির্ধারণসহ বাহকদের চিহ্নিত করতে হবে; যাতে অর্থনীতির অনুকূলে ইতিবাচক কার্যক্রম নেয়ার পথ সুগম হয়; দ্বিতীয়ত. প্রখ্যাত আরও একজন সমাজ বিশ্লেষক কার্ল মার্কসের উক্তি হলো কালো টাকা ছাড়া কোন পুঁজি গঠিত হয় না এবং তা যদি সত্য হয়, তা হলে দেশের ভিতরে যে কালো টাকা রয়েছে তা দিয়ে গঠিত পুঁজি দেশের বড় বড় খাতের বিনিয়োগের মাধ্যমে উন্নয়ন ঘটাতে হবে, যার ফলে বিদেশি নির্ভরতা কমবে; তৃতীয়ত. দেশের ভিতরে কালো টাকার উৎপাদনের ক্ষেত্রগুলো বন্ধ করতে হবে ক্রমান্বয়ে। কাজটি যেহেতু অপ্রদর্শিত অর্থনীতির অংশ, তাই এর প্রশাসনিক কাঠামো এমন হওয়া উচিত যেখানে অবৈধভাবে যেন অর্থ উপার্জনের সুযোগ না থাকে। একজন দার্শনিক বলেছিলেন কেহ যদি বিপুল সম্পদের মালিক হয় তা রক্ষার জন্য পাহারাদার রাখতে হবে, সে যদি জ্ঞানের মালিক হয় তবে এই জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত হয়েই তার জীবন রক্ষা হবে, যার জন্য কোন বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হবে না।

সর্বশেষে বলা যায়, এই কালো টাকা নিয়ে পরীক্ষা – নিরীক্ষায় সময় ব্যয় না করে এর একটি স্থায়ী সমাধানের দিকে যাওয়া উচিত; যার দিকে নীতি – নির্ধারকদের মনোযোগ দিতে হবে।

লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও ডিন, সিটি ইউনির্ভাসিটি।

Short URL: https://biniyogbarta.com/?p=147854

সর্বশেষ খবর