মিহির স্যার

কর আহরনে আয়কর মেলার প্রাসঙ্গিকতা

ড: মিহির কুমার রায়ঃ বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বর্তমান বছরে (২০২১-২০২২) আয়কর মেলার আয়োজন সিমিত আকারে করেছে নিজ নিজ অফিসের নিচে, যার স্থায়িত্ব হবে ১ই নভেম্বর থেকে ৩০শে নভেম্বর, ২০২১ পর্যন্ত এবং মাস ব্যাপী এই মেলার এবারের কোন শ্লোগান নেই। একইসাথে রাজধানীসহ প্রতিটি বিভাগীয় শহরে সাতদিন, প্রতিটি জেলা শহরে চারদিন ও ৪৫টি উপজেলা শহরে ২ দিন করে এই মেলা অনুষ্ঠিত হবে। এই আয়কর মেলার শুরুটা হয়েছিল ২০১০ সালে বর্তমান সরকারের পূর্ববর্তী মেয়াদে, যার বয়স এগার বছর পূর্ন হতে চলছে। প্রথমে এই মেলার সফলতা নিয়ে অনেকেই সন্দীহান ছিল, বিশেষত: করের প্রতি সাধারন মানুষের ভয় ভীতি অনিহা ও অসহযোগিতার কারনে। তাছাড়াও নিজের টাকা হাত থেকে চলে যাবে সরকারের খাতায় না তাছাড়াও তুলতে হবে না জানি কি হয় এই সকল দ্বিধাদ্বন্দ অনেকাংশে কাজ করেছে। কিন্তু বিগত সময়ে এই অবস্থায় অনেক উন্নতি হয়েছে যেখানে করমেলার একটি গুরুত্বপূর্ন ভুমিকা লক্ষনীয়। কারন অনেক করদাতাই এককভাবে কর রিটার্নের ফরম পূরন করতে পারেনা। আবার অনেকেই পূরন করতে পারলেও জমা দিতে গিয়ে যদি হয়রানির স্বীকার হয় এই ধরনের একটি মনস্তত্ব থেকে সাধারন থেকে সাধারন করদাতারা কর মেলাকেই কর প্রদানের নিরাপদ স্থান মনে করে এই কারনে সেখানে একটি উদ্বোধ্যমূলক দৃষ্টি ভঙ্গি নিয়ে আয়োজকরা এগিয়ে মানবিক মূল্যবোধ ভিত্তিতে, যা সাধারন করদাতাদের অনেক মন কেড়েছে। তাছারাও যারা প্রথম নুতন করদাতা তাদেরকেও সহায়তা দেয়ার ব্যবস্থা মেলায় রাখা হয়েছিল হাতে কলমে কিভাবে ফরম পূরন করা হয়। কর নির্ধারিত হওয়ায় পর ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে কিংবা ব্যাংকের পে-অর্ডার মাধ্যমে কি ভাবে টাকা জমা দিতে হয়, যেখানে মেলার স্থানে পে-অর্ডারও ইস্যু করা এবং লাইনে দাড়িয়ে নির্ধারিত কর অঞ্চলের কাউন্টারের লাইনে দাড়িয়ে রিটার্ন জমা দিতে দেয়া যার বিনিময়ে করমেলার মনোগ্রাম সম্বলিত একটি ব্যাগ, ১টি পানির বোতল, ১টি কলম, ১টি প্যাড, একটি প্যাকেট বিস্কুট যা কর দাতাদের জন্য একটি বাড়তি উৎসাহের উপকরন বলে বিবেচিত ছিল। কিন্তু করোনাকালে (২০২০) ও বর্তমান বছরে এর কিছুটা ব্যতিক্রম হয়েছে।

আরও মজার ব্যপার করমেলায় সিনিয়র সিটিজেন, মুক্তিযোদ্ধা, উপজাতি, বিকলাঙ্গ এই সকল শ্রেনীর জন্য আলাদা কাউন্টার বিশেষত: বয়স্কদের বেলায় এই সুযোগ করে দেয়ায় সরকার বিশেষভাবে প্রশংসার দাবিদার। কারন জীবনের পরন্তবেলায় এসে কর প্রদানের এই যে বিরল সুযোগ কি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মনে থাকবে যার অংশীদার আমিও স্বয়ং। 

উপরের আলোচনা থেকে এটাই প্রতিয়মান হয় যে, এ দেশের করযোগ্য মানুষ কর দিতে চায় কিন্তু করবান্ধব একটি মনোরম পরিবেশ পায় না যা বর্তমান সরকার ২০১০ সালের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে ক্ষমতায় আসিন থাকায়  করমেলার মাধ্যমে সৃষ্ঠি করতে সক্ষম হয়েছে, যা বর্তমান সরকারের বড় সাফল্য। মানুষ এখন করভীতি থেকে মুক্ত, উপজেলা পর্যায়ে করের অফিস খোলার কাজ চলছে, উদারনৈতিক শৈথিল্যের পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে, বর্তমান নীতির ফলে সরকারী- আধা সরকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা কর্মচারীরাও করের আওতায় এসেছে ও দেশের শ্রেষ্ঠ করদতাদের সন্মানণা দেয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে- দেশের বড় বড় করদাতাদের (ধনী-অতিধনী) নাম শ্রেষ্ঠত্বেও তালিকায় নেই, যেমন শেয়ারবাজারের তালিকাভুক্ত পরিচালক, যেমন ধন্য চিকিৎসক যারা এক হাজার থেকে দু-হাজার টাকার রোগী প্রতি ফি-এর বিনিময়ে সারা রাত্রির ঘুম হারাম করে রোগী দেখেন, আদালতের উকিল ব্যারিষ্টার যারা প্রতি শুনাণীতে লাখ টাকা ফি আদায় করেন ইত্যাদির নামের তালিকা। তাদের নাম যদি তালিকাভুক্ত থাকত ও কর দিতেন তা হলে সরকারের ঘাটতি বাজেট পূরনের জন্য ব্যাকিং ব্যবস্থা কিংবা বৈদেশিক সাহায্য থেকে ঋন গ্রহনের প্রয়োজন হতো না। আবার যারা টিনধারী তারা অনেকেই কর কিংবা রিটার্ণ জমা দেন না যদিও আগের তুলনায় তাদের হারটা কমছে। তারপরও করদাতার সিংহভাগ সরকারী কর্মকর্তা এবং বেসরকারী কর্মকর্তারাও এর মধ্যে যোগ হয়েছেন যা অনেকটা আশার কথা এবং এই পরিবেশ বজায় থাকলে Tax Complyance দিন দিন বাড়বে, ব্যাংক থেকে ধার কমবে, Tax-GDP Ratio  বাড়বে।
 
আমরা যদি বেষ্টিক অর্থনীতির আলোকে বিষয়টিকে বিশ্লেষন করি তা হলে দেখা যায় যে, আয়কর প্রত্যক্ষ করের অংশ এবং বাংলাদেশের রাজস্ব আদায়ের প্রত্যক্ষ করের অবদান ক্রমশ বাড়ছে এবং ২০১৯-২০ অর্থ বছরে বাজেটের প্রত্যক্ষ করের অংশ ৩৩% ধরা হয়েছে। প্রবৃদ্ধির বর্তমান এই ধারা অব্যাহত থাকায় ২০২০-২১ অর্থ বছরের মধ্যে মোট কর রাজস্বে প্রত্যক্ষ করের অবদান ৫০% ছাড়িয়ে গেছে। এখানে উল্লেখ্য যে, রাজস্ব প্রাপ্তি হিসাবে আয়কর বিশেষ ভাব মূল্য সংযোজন কর (মূসক) ও আমদানী শুল্ক ( আশূক) এর পেছনে রয়েছে। অথচ, হওয়ার কথা ছিল উল্টো চিত্র অর্থাৎ বর্তমানে সার্বিক রাজস্ব আয়ে মূসকের অংশ ৩৭% এবং আশুক এর অংশ ৩০%। যদি বিগত ছয় বছরের উপাত্ত পর্যালোচনা করা হয় তবে দেখা যায় যে, (২০১২-১৭) গড় প্রবৃদ্ধি আমদানীতে (২২%), জিডিপি (৫-৭%) ও মূল্যস্ফীতির (৭-৯%) এবং স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবসায়ী কার্যক্রম  পরোক্ষ কর থেকে আয়ের ২৫% এর বেশী হওয়া যুক্তিযুক্ত। আমরা যদি বর্তমান বছরের বাজেটের দিকে তাকাই তবে লক্ষনীয় বাজেটের প্রাক্কলিত মোট আয় ৩,৭৭,৮১০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে যা জিডিপি এর ১৪.৫৩%। এর মধ্যে রাজস্ব আয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৩,২৫,৬০০ কোটি টাকা যা জিডিপি এর ১৪.১% যার ৮০% জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এন.বি.আর) আহরন করবে।

দেশে কর-জিডিপি অনুপাত তুলনামূলক কম হলেও প্রতি বছর রাজস্ব আয়ে প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে এবং সরকারের লক্ষ্য আগামি দুই বছরের মধ্যে কর - জিডিপি অনুপাত বর্তমানে ১০শতাংশ থেকে ১৮ শতাংশে উন্নীত হবে। গত বছর থেকে ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন হচ্ছে এবং ১৫% ভ্যাটের পাশাপাশি নির্দিষ্ট কর পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে ৫%,৭.৫% ও ১০% ভ্যাটারোপ, স্থানীয ব্যবসায়ী পর্যায়ে করবার কমানোর জন্য ভ্যাট হার ৫% নির্ধারন, ঔষধ ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের ক্ষেত্রে ভ্যাটের হার ২.৪০% এবং ২% অব্যাহত রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ অর্থনেতিক অঞ্চল ও পিপিপি প্রকল্পে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ভ্যাটের অব্যাহতি পাবে। তাছাড়াও কৃষি যন্ত্রপাতি, নারী উদ্যোক্তা পরিচালিত ব্যবসায়, শোরুম, বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে জোগানদার ও  বিদ্যুৎ বিতরনকারী সেবার উপর ভ্যাটর অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য যে, মোট কর রাজস্বে আয় করের অবস্থা ক্রমান্বয়ে উন্নতি হচ্ছে যা আরও সন্তুষ্ট হওয়া বাঞ্ছনীয় কারন যে গতিতে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে কখনো বাড়ছে কথনো কমছে যা স্থিতিশীল গতিতে প্রবাহিত হওয়া প্রয়োজন। কারন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আয়কর আদায়ের হার সমধর্মী অন্যান্য করের শ্রেণীর চেয়ে অনেক অগ্রগামী এবং প্রত্যক্ষ করের প্রাধান্য সবসময় বেশী কিন্তু আমাদের অবস্থা হলো এই বিষয়গুলোকে প্রাতিষ্ঠানিভাবে দূর্বল রয়েছে অনেকদিন থেকে, যেমন: এই জটিল কাজটি সমাধান করার জন্য দক্ষ লোকের অভাব, সাধারন মানুষের করের প্রতি ভয়ভীতি যা তাদের অনাগ্রহকে অনেকাংশে ত্বরান্বিত করে। এই ক্ষেত্রে নৈতিকতার প্রশ্নটি বিশেষভবে জড়িত। 

স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশের এই পথ পরিক্রমায় পাঁচ দশক পরেও দেশের কর্পোরেট ব্যবসা বানিজ্য বৃদ্ধি পেলেও কোম্পানি প্রদত্ব আয়করের প্রবৃদ্ধি তেমন হারে বাড়েনি। অপর দিকে কোম্পানি ব্যাতিত করদাতাদের মধ্যে ব্যাক্তি করদাতা, পার্টনারশীপ ফার্ম, এসোসিয়েশন অব পারসনস ইত্যাদি রয়েছে যাদের কর্পোরেট করের আওতায় আনার উদ্যোগ গ্রহন করা প্রয়োজন। সার্বিক পরিস্থিতি মূল্যায়নে ইহা বলতে কোন দ্বিধা নেই যে, প্রতি বছর জুলাই-নভেম্বর মাস আসলেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর মেলা আয়োজন থেকে শুরু করে অন্যান্য আনুসাঙ্গিক কার্যক্রম চোখে পড়ে কিন্তু সারা বছরব্যাপি এই ধরনের তৎপরতা চোখে পড়েনি অথচ বাজেট ভিত্তিক সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় রাজস্ব আদায়ের বিষয়টি অতীব জাতীয় গুরত্বপূর্ন যার সাথে সরকারের প্রসাশনিক পরিচালনার ব্যয়ের বিষয়টি জড়িত। কারন প্রতি বছর সরকার রাজস্ব আয়ের ঘাটতির কারনে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে কোটি কোটি টাকা ধার করে প্রশাসনিক ব্যয় বহন করতে হয় যা অত্যন্ত দুঃখজনক। বর্ণিত অবস্থায় সার্বিক কর ব্যবস্থায় কিছু সুপারিশ নিম্নে প্রদত্ত হলো:

প্রথমত: জাতীয় রাজস্ব বোডর্কে প্রশাসনিকভাবে কাঠামোগত বিন্যাসের প্রয়োজন রয়েছে এবং এখন পর্যন্ত উপজেলা পর্যায়ে কর কাঠামোর কোন অফিস নেই যা থাকা বাঞ্চনীয়। কারন উপজেলা শহরগুলোতে বেশীরভাগ ব্যবসায়ী কর প্রশাসনে রেজিস্টিভুক্ত নয় এবং অনেক ক্ষেত্রে কেহ কোন দিন তাদেরকে অবহিত করেনি। কর মেলা কেবল ঢাকা সহ বিভাগীয় শহরে ও জেলা শহরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, উপজেলা শহরগুলোতে কম হয়। এ ব্যাপারে আরও গতিশীল হওয়া প্রয়োজন;

দ্বিতীয়ত: কর প্রশাসনের প্রতি করযোগ্য জনগনের অনিহা ও ভয়ভীতি অনেকাংশে সাধারন মানুষকে কর প্রদান থেকে বিরত রাখে। এই ব্যাপারে ব্যাপক প্রচার এবং প্রসার ও প্রশিক্ষনের প্রয়োজন রযেছে। কারন সার্বিক আয়করের বিষয়টির সাথে ব্যবসা বানিজ্য সহ আর্থিক ব্যবস্থাপনা জড়িত বিধায় কাজটি অনেক ক্ষেত্রে হিসাব নিরুপন ও কর যুক্ত আয় বাহির করা কিছুটা কষ্ট সাধ্য। এ ব্যাপারে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে হাতে কলমে প্রশিক্ষন প্রদান এবং উদ্বোধ্বকরন কর্মসূচীতে যোগদান করার প্রয়োজন রয়েছে।

তৃতীয়ত: জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে বিভিন্ন প্রশাসনিক কাঠামোতে দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে যা অবিলম্বে গোছানোর প্রয়োজন। সরকার এই বিষয়গুলিকে কম নজর দিচ্ছে অথচ রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে এই সংস্থাটির গুরুত্ব অপরিসীম। তাছাড়াও স্টাফ পর্যায়ে যে সমস্ত জনবল রয়েছে তারা বিভিন্ন সময় কর প্রদানের আগ্রহী ব্যাক্তিদের বিভিন্নভাবে হয়রানী করে থাকে যা প্রতিনিয়তই শোনা যায়,  ফলে যাদের ব্যবসার আকার বড় তারা সরাসরি না গিয়ে আয়কর উকিলের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করের রিটার্ন জমা দেয় যা তাদের জন্য একটা বাড়তি খরচ;

চতুর্থত: সার্বিক কর ব্যবস্থার প্রত্যক্ষ করের প্রাধান্য বাড়ানো প্রয়োজন এবং এর অংশ হিসাবে সকল টিনধারীকে আয়কর রিটার্ন প্রদানে বাধ্য করতে হবে। এর অংশ হিসাবে আইনের ভয় দেখিয়ে নয় বরংচ বুঝিয়ে বাংলাদেশের জাতী গঠনে তাদের প্রদেয় করের যে ভূমিকা রয়েছে তা বুঝাতে হবে। তবেই কেবল জাতী গঠনে কর কাঠামো তথা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সম্মান জাতীর কাছে উঠে আসবে।

পঞ্চমত: বাংলাদেশে টিনধারী লোকের সংখ্যা কত এবং তার মধ্যে কতজন নিয়মিত কর দেয় তার সঠিক হিসাব নিরুপন করা প্রয়োজন এবং কর মেলার পরও সারাবছর ধরে এনবিআর কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে জাতী তাই প্রত্যাশা করে। Moralization কর মেলার একটি বড় কর্মসূচী হওয়া উচিত।

লেখক: অধ্যাপক ও গবেষক, সিটি ইউনির্ভাসিটি, ঢাকা।


Comment As:

Comment (0)